চলতি ২০১৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অ্যাঙ্গাস ডিটন গতানুগতিক তাত্ত্বিক গবেষণার বাইরেও কিছু কাজ করেছেন। তেমনই এক অপ্রথাগত গবেষণায় তিনি মানুষের ‘আত্মহত্যা, বয়স ও ভালো থাকার’ মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে এনেছেন। তত্ত্বের চেয়ে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেশি জোর দিয়েই গবেষণাটি করেন তিনি।
‘আত্মহত্যা, বয়স ও ভালো থাকা: একটি পর্যবেক্ষণমূলক অনুসন্ধান’ শীর্ষক এই গবেষণায় তাঁর সহ-গবেষক ছিলেন অ্যানি কেস। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাঁরা এই গবেষণা করেন। তা থেকে আকর্ষণীয় কিছু দিক নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।
আত্মহত্যার অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী স্বতঃসিদ্ধ ধারণা হলো, মানুষ তখনই এ পথ বেছে নেয়, যখন তার কাছে মরে যাওয়াটাকেই বেঁচে থাকার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কিন্তু মরার আগেই মরার পথে কেন যেতে হবে, তা ভেবে আমি অবাক হই।
অর্থনৈতিক তত্ত্বের একটি বিকল্প যুক্তি হলো, কখনো কখনো মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যাপক চিন্তা না করেই বর্তমান কোনো আবেগে তাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করে থাকে। এটাকেই আমার যৌক্তিক মনে হয়।
অ্যাঙ্গাস ডিটনের গবেষণামতে, নারীদের চেয়ে পুরুষেরা প্রায় চার গুণ বেশি আত্মহত্যা করে। সম্ভবত নারীরা বেঁচে থাকাটাকেই পুরুষদের চেয়ে বেশি সুখের মনে করে বলে এমনটি হয়ে থাকতে পারে।
পুরুষেরা সাধারণত মধ্য বয়সেই সবচেয়ে কম আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে নারীরা তরুণ ও বৃদ্ধ বয়সের চেয়ে মধ্য বয়সেই বেশি আত্মহত্যা করে।
ডিটনের গবেষণা অনুযায়ী বিয়ে করলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে। আমি মনে করি, বিয়েটাই তো একটা আত্মহত্যা! সুতরাং আপনার পুনরায় অর্থাৎ দ্বিতীয়বার আত্মহত্যা করার দরকার নেই!
গবেষণামতে, যুক্তরাষ্ট্রে সপ্তাহের সব দিনই সমান হারে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে না। সেই দেশের মানুষ আত্মহত্যা করতে সোমবারকেই সবচেয়ে বেশি বেছে নেন। এরপর মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। রোববার সামান্য বাড়ে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এ প্রবণতা প্রযোজ্য। সপ্তাহের সব দিনেই জীবনের মূল্য সমান। তবে অন্য দিনগুলোর তুলনায় উইক এন্ড বা সপ্তাহের শেষ দিনে যেমন অধিকতর হাসিঠাট্টা, আনন্দ, সুখ বেশি অনুভূত হয়, তেমনি দুঃখ, দুশ্চিন্তা, চাপ, রাগ ও শারীরিক যাতনার মাত্রা কম হয়। রোববার থেকে আবার সুখের মাত্রা কমে আসে। পরিণতিতে সোমবারে আত্মহত্যা বেশি হয়। যারা আত্মহত্যা করে তারা সম্ভবত সপ্তাহান্তে আনন্দ ও সুখভোগের পরই এ পথ বেছে নেয়!
ডিটন তাঁর গবেষণাটির উপসংহার টেনেছেন এভাবে, বেদনা বা যন্ত্রণা খুব নিবিড়ভাবেই আত্মহত্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যারা দীর্ঘদিন ধরে রোগজনিত যন্ত্রণায় ভোগে, তারা অনেক সময় আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কারণ, কোথাও কোথাও প্রবল রোগ-যন্ত্রণার পরিস্থিতিতে আত্মহত্যাকে আইনগতভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়।
কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণাই শুধু নয়, সামাজিক কলঙ্ক বা ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশাও তো মানুষকে অমন পথে ঠেলে দিতে পারে।
লেখক: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ।