nirbhiknews_02চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস উঠে আসে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চিত্র প্রাণবন্ত। কিন্তু রফতানি ও রেমিট্যান্স এ চিত্র পাল্টে দিতে পারে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে মুদ্রা বিনিময় হার, রাজস্ব আহরণ ও তারল্য ব্যবস্থাপনায়। অন্যদিকে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অবদানও বেড়েছে। একই সঙ্গে মূলধনি যন্ত্রের আমদানিও বেড়েছে। তবে এ বৃদ্ধির গতি নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা আলোকপাত করেন।

প্রতিবেদনের ওপর একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন:

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট  ড. জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কতটুকু, তার ওপর একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিকে কীভাবে আরো গতিশীল করা যায়, জরিপ তথ্যের ভিত্তিতে তার ওপরও পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে।

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে প্রাণবন্ত চিত্র এত দিন দেখা গেছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। তবে রফতানি ও রেমিট্যান্সে পরিস্থিতি কিছুটা প্রতিকূল। এছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতিও মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মুদ্রা বিনিময় হার, রাজস্ব আদায় ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানগুলো বিগত দিনগুলোয় ৬-৭ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। সর্বশেষ শিল্প খাতের কারণে প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের উপরে উঠে যায়। এর বিপরীতে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি কমলেও সেবা খাতে কিছুটা বেড়েছে।

রফতানি খাত প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খাতটিতে অতীতেও অনেক ওঠানামা দেখা গেছে। এবার যেটা দেখা যাচ্ছে, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রফতানি প্রবৃদ্ধি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে অর্ধেক হয়েছে। এর কারণ ছিল বিশ্ব অর্থনীতির দুর্বলতা। এছাড়া মুদ্রা বিনিময় হার ও রফতানি বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি।

রেমিট্যান্সে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে মন্তব্য করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, গত বছরও রেমিট্যান্স কমেছিল, তবে এ বছরের ধরনটি ভিন্ন। এবার শুধু জিসিসি (গালফ কো-অপারেশন কান্ট্রিজ- মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো) নয়, এর বাইরের দেশগুলো থেকেও রেমিট্যান্স কমেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্স কমেছে সৌদি আরবের চেয়েও বেশি পরিমাণে। কাজেই শুধু রেমিট্যান্স কমার পেছনে তেলের দরপতনকে আর দায়ী করা যাচ্ছে না। রেমিট্যান্স কমার পেছনে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিবাসন নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তাও দায়ী। আবার মুদ্রা পাচার নীতির কঠোর প্রয়োগের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এখন ডি-রিস্কিং মুডে চলে গেছে। এসব কারণে টাকা স্থানান্তর কঠিন হয়েছে। তবে এ সময় ইনফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে।

বিনিয়োগের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ অর্থবছরে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অবদান বেড়েছে ১ শতাংশ। এটি ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন। গত কয়েক বছরে এ ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। এর পাশাপাশি বর্তমানে কী ঘটছে, তার সূচক হলো মূলধনি যন্ত্রের আমদানি। সেখানেও দেখা যাচ্ছে ঋণপত্র নিষ্পত্তিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যার হার ৬৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এছাড়া টেক্সটাইল খাতের মেশিনারি আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি ৫২ শতাংশ, চামড়া খাতের ১৮৪ দশমিক ৫, গার্মেন্টের ২৬ দশমিক ২ ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের মেশিনারি আমদানি প্রবৃদ্ধি ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, এই যে ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনি যন্ত্র) আমদানি বাড়ছে, এটা কি কারণে বাড়ছে? এখানে কতটা প্রকৃত ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি? কতটা ইনভয়েসিং ও প্রাইসিংয়ের বিষয় এখানে জড়িত। মুদ্রা পাচার নিয়েও অনেক কথাবার্তা রয়েছে। বিস্তারিত খতিয়ে না দেখে এ বিষয়ে বলা যাচ্ছে না, তবে এখানে একটা প্রশ্ন রয়ে গেছে। পরিসংখ্যান থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু তা কোথায় হচ্ছে, কী পরিমাণে হচ্ছে, সেটি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়ে গেছে।

অর্থনীতির পূর্বাভাস ও ঝুঁকি প্রসঙ্গে গতকাল বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী অর্থবছরের অর্থনীতিতে ২০১৯ সালের নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ কিছু ঝুঁকি রয়েছে।

প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য প্রতিবেদনে তিনটি সুপারিশ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে সরকারি বিনিয়োগে দক্ষতা, শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার বাড়াতে হবে।