photo-1487573072দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্ব বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ওপর ন্যস্ত করে ১৯৭২ সালে জারি করা হয় রাষ্ট্রপতির ৫৯ নম্বর অধ্যাদেশ। এর পর গত চার দশকে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এসেছে বিপুল পরিবর্তন। একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজটি শুধু বিপিডিবির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্তমানে এ খাতে এসেছে একাধিক বেসরকারি উদ্যোক্তা। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্ব দিয়ে তৈরি হয়েছে আলাদা কোম্পানি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০১৭। এরই মধ্যে আইনের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এখন এর ওপর মতামত আহ্বান করা হয়েছে।

নতুন এ আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অব্যাহত রাখা এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে অধ্যাদেশটি যুগোপযোগী করে নতুন আইন করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ইংরেজিতে লেখা আগের অধ্যাদেশটি বাংলা করে আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে এ খাতের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বেশকিছু সংশোধন আনা হয়েছে এতে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে অন্যতম হলো— বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় আলাদা কোম্পানি গঠন। এক্ষেত্রে সিঙ্গেল বায়ার হিসেবে বিপিডিবির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আইনের খসড়ায়।
খসড়া অনুযায়ী, সাত সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে বোর্ড। এর মধ্যে সরকার নিযুক্ত একজন চেয়ারম্যান থাকবেন, যিনি বোর্ডের সভাপতি হবেন। এছাড়া বোর্ডের অন্য সার্বক্ষণিক সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন— সদস্য (উৎপাদন), সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), সদস্য (বিতরণ), সদস্য (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স), সদস্য (প্রশাসন) ও সদস্য (অর্থ)। বোর্ডের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় থাকবে। তবে সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় দেশের যেকোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করা যাবে।
খসড়া আইন অনুযায়ী, বোর্ডের চেয়ারম্যান, সদস্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনসেবক হিসেবে গণ্য হবেন। বোর্ডের চাকরি সরকারের জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় সার্ভিস হিসেবে বিবেচিত হবে।

আইনে পরিবর্তিত এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন করে বিপিডিবির কাজের আওতা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশে বিদ্যুৎ সম্পদের উন্নয়ন ও সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে বিপিডিবি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সুষ্ঠু সমন্বয় ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিপিডিবি কর্তৃৃক নির্ধারিত ইকোনমিক লোড ডেসপাচ শিডিউল অনুযায়ী মেরিট অর্ডার বাস্তবায়নে তদারকি করবে বোর্ড। সিঙ্গেল বায়ার হিসেবে বিপিডিবি সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সংস্থা, কোম্পানি, আইপিপি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র বা ব্যক্তির কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় ও বিতরণের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত যেকোনো সংস্থা, কোম্পানি বা বড় গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করবে। এছাড়া সিঙ্গেল বায়ার হিসেবে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করবে বিপিডিবি।
বিপিডিবির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো. কাওসার আমির আলী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যমান যে অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিপিডিবির কার্যক্রম চলছে, তা অনেক আগে তৈরি। বর্তমানে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এর অন্যতম। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নতুন আইনটি করা হচ্ছে। এতে সিঙ্গেল বায়ার হিসেবে বিপিডিবির ভূমিকাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ক হিসেবেও কাজ করবে বিপিডিবি।

আইনের খসড়া অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রস্তুত, মেরামত, পরীক্ষাকরণ ল্যাব ও রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ব্যবসায় অংশগ্রহণ ও তার অধীনে কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালন এবং এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবে বোর্ড। বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে সরকার ও অন্যান্য সংস্থা বা ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ, মঞ্জুরি, সম্পদ, সম্পত্তি, স্থাপনা, ইত্যাদি ঋণ, দান ও অনুদান গ্রহণ করবে। ক্রয়, ইজারা, বিনিময় অথবা ভূমি থেকে প্রাপ্ত আয় ও বিক্রয়লব্ধ আয় অথবা এ ধরনের ভূমি অথবা ভূমি থেকে প্রাপ্ত যেকোনো আয় করতে পারবে। প্রয়োজন মনে করলে সরকারের অনুমোদনক্রমে এ আইন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যাদি সম্পাদন ও বিধি-প্রবিধি প্রণয়ন করবে বিপিডিবি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০১৭-এর খসড়া অনুযায়ী, সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুষ্ঠু সমন্বয়ের জন্য সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে শেয়ার অনুযায়ী বোর্ডের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত থাকবে। নিজস্ব নীতিমালা ও দেশের প্রচলিত নিয়মনীতির আলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থা-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে দেশী বা বিদেশী সংস্থার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় কোম্পানি গঠনের ক্ষমতা থাকবে বোর্ডের। এছাড়া সরকারের অনুমোদনক্রমে প্রয়োজন মনে করলে সব বিদ্যুেকন্দ্র এবং সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, সংরক্ষণ কাজের মান ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পদ্ধতির মান নির্ধারণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পদ্ধতি সহজীকরণ করতে পারবে বিপিডিবি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত সব ধরনের মালামাল ও জ্বালানি প্রয়োজনে আমদানি ও এ-সংক্রান্ত নীতিমালা দেশের প্রচলিত আইন বা বিধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রণয়নের ক্ষমতা পাবে সংস্থাটি। পাশাপাশি সরকারের অনুমোদনক্রমে লাইসেন্সির মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রকে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্র ঘোষণা ও এ ধরনের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কর্তৃত্ব পাবে বিপিডিবি। বোর্ড সরকারের অনুমোদনক্রমে যেকোনো স্কিম বা প্রকল্প বাস্তবায়ন অথবা কারিগরি তত্ত্বাবধান করতে পারবে।