nirbhiknewsসুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৭-২৭-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে বন অধিদপ্তর। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রণীত পরিকল্পনাটি বর্তমানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। পরিকল্পনায় প্রতিবেশের ক্ষয় ও দূষণ রোধে সুন্দরবনের চারপাশে ২০ কিলোমিটার এলাকাকে বাফার জোন করার কথা বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি নিয়ে যা সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকবে বন বিভাগ। পরিকল্পনায় একই সঙ্গে এ বাফার জোনকে শিল্পায়ন ও ভারী অবকাঠামোমুক্ত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

খসড়া অ্যাকশন প্ল্যানে বলা হয়, প্রতিবেশের ক্ষয়রোধ ও মনুষ্যসৃষ্ট দূষণের কারণে সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন (ইসিএ) বলে ঘোষণা করা হয়েছে। নিচু ভূমিতে অবস্থান এবং নিয়মিতভাবে বন্যা ও স্রোতে প্লাবিত হওয়ার কারণে এসব দূষণের প্রভাব সুন্দরবনের সীমানা থেকে আশপাশের ২০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এ এলাকা যাতে বাফার জোন হিসেবে কাজ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বন বিভাগকেও যথাযথ আইনি কর্তৃত্ব নিয়েই এর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এসব কর্মকাণ্ডে সুন্দরবন-সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরগুলোর পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন বিভাগকে যুক্ত করতে হবে।

পরিকল্পনায় আরো বলা হয়, ইসিএ ও বাফার জোনে শিল্পায়ন ও বড় অবকাঠামো যাতে না গড়ে ওঠে, সেজন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে।

টাইগার অ্যাকশন প্ল্যানে বাফার জোনে শিল্প ও ভারী অবকাঠামো স্থাপন না করার কথা বলা হলেও এলাকাটিতে এরই মধ্যে বেশকিছু শিল্প-কারখানা ও অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে মংলা সমুদ্রবন্দর, মংলা ইপিজেড ও আশপাশের এলাকায় শিল্প-কারখানার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যেই শিল্প-কারখানা রয়েছে ১৮০টিরও বেশি। রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে বনের ১৪ কিলোমিটার দূরে। বর্তমানে এসব শিল্প-প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন থেকে বিরত রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সার্বিক বিষয় এখনো জাতীয় পরিবেশ কমিটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পরিবেশ কমিটিতে বিদ্যমান শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখানে রেখে দেয়ার পক্ষেই মতামত দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

খসড়া প্রণয়ন কমিটির প্রধান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, সুন্দরবনের সীমানার বাইরে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ইসিএ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এখানে ঘটে যাওয়া দূষণের প্রভাব পড়ে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত। দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবন ও বাঘ সংরক্ষণ করতে হলে গোটা অঞ্চলটিকেই সংরক্ষণ করতে হবে। তবে এ পরিকল্পনা শুধু বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে শিকার রোধে। এটি করতে পারলে আগামী অ্যাকশন প্ল্যানের মেয়াদে বাঘের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে।

পরিকল্পনায় বাঘ হত্যা, বাঘের খাদ্য সংকট ও আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকে প্রাণীটির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এছাড়া গৃহীত নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন উদ্যোগ, বন সংরক্ষণ ও আইন প্রয়োগ, শিক্ষা ও সচেতনতা, গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, স্থানীয় বাসিন্দাসহ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বয় সাধনকে প্রাণীটির সংরক্ষণ কার্যক্রমে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অ্যাকশন প্ল্যানে বাঘ সংরক্ষণে প্রথম কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে চোরাশিকার রোধকে। চোরাশিকারিদের ঠেকানোর জন্য পরিকল্পনায় সুন্দরবনে বন বিভাগের চেকপোস্টগুলোকে আরো শক্তিশালী করে তোলার পাশাপাশি নিয়মিত টহলের মাত্রা বাড়ানোর প্রস্তাবনা আনা হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের ভেতরে স্মার্ট প্যাট্রোলিং কার্যক্রমকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে মূল কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

টাইগার অ্যাকশন প্ল্যানের সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বন বিভাগের প্রধান বন্যপ্রাণী সংরক্ষক জাহিদুল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, প্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করে গত মাসে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর তা অনুমোদন দেয়া হবে। বাফার ব্যবস্থাপনা আমাদের খুব প্রয়োজন। এখানে যারা থাকে, তারা বনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বনের আশপাশে কী ঘটে, এসব তথ্যও তাদের কাছে থাকে। এ কারণে তাদের সহায়তা পেলে সংরক্ষণের উদ্যোগগুলোকে সফল করে তোলা যাবে। পরিবেশ অধিদপ্তর ইসিএ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বাফার জোন ব্যবস্থাপনায় বন বিভাগের কোনো সমস্যা হবে না। দুই বিভাগের কাজের ধরন ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য একই। তাই দুটি বিভাগের মধ্যে আরো বেশি সমন্বয় থাকা দরকার।

তিনি বলেন, গত দুই বছরে চোরাশিকার ও পাচার রোধ কার্যক্রমের বেশ উন্নতি হয়েছে। এতে র্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এতে বন বিভাগকে সহায়তা করেছে। বন বিভাগের পোস্টগুলো শক্তিশালী করার মতো ফান্ড দিতেও প্রস্তুত রয়েছে সরকার। আশা করছি, ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির যে লক্ষ্য রয়েছে, সে বিষয়ে সুসংবাদ দিতে পারব আমরা।