nibhiknewsপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি ষড়যন্ত্র দেখে আসছি। আমি এগুলোর পরোয়া করি না। আমি বিশ্বাস করি, যতদিন মহান আল্লাহ ও বাংলার জনগণ আমার পাশে রয়েছেন, মা-বাবার দোয়া ও আশীর্বাদ রয়েছে, ততদিন লক্ষ্য অর্জন কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

৩৬তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে গণভবনে গতকাল দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে ১৯৮১ সালের এই দিনে দেশে ফিরে আসেন তিনি। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দিবসটি উপলক্ষে এদিন প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। খবর বাসস।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসলে ঘরের শত্রু বিভীষণ। ঘরের ভেতর থেকে শত্রুতা না করলে বাইরের শত্রু সুযোগ পায় না। বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের অনেকেরই আমাদের বাসায় যাতায়াত ছিল। আন্তরিকতা নয়, এদের লক্ষ্য ছিল চক্রান্ত করা। সত্যি কথা বলতে কি, সেটা কেউ বুঝতে পারিনি।

খন্দকার মোশতাক তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা এভাবে বেইমানি করে, তারা থাকতে পারে না। মীর জাফরও তিন মাস ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। মোশতাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয়। এতে স্পষ্ট যে, তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র ছিল ও তারা ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের ত্রাণ দিতে গেছি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, রাস্তায় পানি, তখন একজন বৃদ্ধা তার ঘরে ডেকে নিয়ে খেজুরপাতার পাটিতে বসতে দিলেন। বাড়ির উঠোনে নারকেল গাছ, সেখান থেকে একটি ডাব পেড়ে এনে বললেন, মা খাও। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বাবা তো আমাদের জন্য তার জীবনটাই দিয়ে গেছে, তুমিও মা নামছ এই কাজে! তুমিও এমন চেষ্টা করে যাচ্ছ! পর্ণ কুটিরের একজন মানুষের এই যে অনুভূতি, এটুকুই তো আমার পাওনা। যাদের জন্য আমার বাবা সারা জীবন কষ্ট করেছেন, তাদের জন্য কিছু করতে পারাই তো সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

শেখ হাসিনা বলেন, মৃত্যুকে আমি পরোয়া করি না। মৃত্যুকে তো আমি বারবার সামনে থেকে দেখেছি। কিন্তু কখনো ভয় পাইনি, ঘাবড়াইওনি। কারণ আমার একটা বিশ্বাস আছে, সৃষ্টিকর্তা আমাকে এ জীবনটা দিয়েছেন আমাকে দিয়ে কিছু কাজ করাবেন বলে। আর এটা হয়তো আমার আব্বা-আম্মারই আকাঙ্ক্ষা ও আশীর্বাদ। তা না হলে আমার পক্ষে এত কিছু সম্ভব ছিল না।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে বিদেশ যাওয়া ও ফিরে আসার বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সে সময় বিদেশ যাওয়া ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেবার বিদেশে যেতে যেন কিছুতেই মন টানছিল না। আমরা খুব কাঁদছিলাম। কিন্তু যেতে হলো। তেজগাঁও বিমানবন্দর হয়েই আমরা দিল্লি ও সেখান থেকে জার্মানি যাই। কামাল, জামাল, রাসেল সবাইকে রেখে গিয়েছিলাম। সবাই এসেছিল এয়ারপোর্টে। আর এই ১৭ মে যেদিন ফিরে আসি, সেদিন লাখো মানুষ। সেই মানুষের ভিড়ে আমি ৩০ জুলাই যাদের রেখে গিয়েছিলাম, তাদের কাউকে পাইনি। বনানীতে গিয়ে পেলাম সারি সারি কবর। জানি না, আল্লাহ আমাকে কত শক্তি দিয়েছেন সহ্য করতে। এ দেশের জন্যই তো আমার আব্বা সারাটা জীবন এত কষ্ট করেছেন। কারাগারে যেখানে তিনি (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন, সেটা তো আজ উন্মুক্ত। সবাই গিয়ে দেখে আসতে পারেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) দুঃখকে কোনোদিন দুঃখ, কষ্টকে কোনোদিন কষ্ট মনে করেননি। বাংলাদেশের মানুষের কথাই ভেবেছেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এত কথা যে আমাকে বলতে হবে, সেটা চিন্তাও করিনি। তবু মনে হয়, আমাদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও জানার দরকার রয়েছে। আমি যখন দেশে ফিরি, সে সময় আজকের অনেকের জন্মই হয়নি। আর তখন যারা ছিলেন, তাদেরও অনেকে বেঁচে নেই। আমি একটা কথাই বলব, আমরা যারা রাজনীতি করি, তারা যদি জাতির পিতার রাজনীতির দিকে তাকাই ও তার আদর্শটা ধারণ করি, তাহলে আমরা দেশকে কিছু দিতে পারব, দেশের মানুষকেও দিতে পারব।

পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক অধ্যায় সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, কখনো ভাবতেও পারিনি, এ রকম ঘটনা আমাদের জীবনে আসবে। মাত্র ১৫ দিন আগে আমি আর রেহানা দেশ ছেড়ে বিদেশে যাই। অল্প সময়ের জন্য গিয়েছিলাম। চলে আসব, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, ফিরতে পারলাম না। ’৭৫-এর কালো দিন আমাদের জীবনের সবকিছু কেড়ে নিল। শুধু আমরা হারিয়েছি তা তো নয়, বাংলাদেশের জনগণ যে স্বপ্ন নিয়ে, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জাতির পিতার ডাকে অস্ত্র হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

জার্মানিতে বসে পরিবারের সব সদস্য নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়ার দুর্বিষহ সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যখন শুনলাম, সহ্য করাটা কঠিন ছিল। ১৬ তারিখে ড. কামাল হোসেন এলেন বনে হুমায়ুন রশিদ সাহেবের বাসায়। রেহানা ছোট, সে বলল, চাচা আপনি মোশতাকের মন্ত্রিত্ব নেবেন না। আপনি প্রেস কনফারেন্স করেন, আপনি এ হত্যার প্রতিবাদ করেন। হুমায়ুন রশিদ সাহেব প্রেস কনফারেন্সের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু উনি কোনো কথা বলতে রাজি হলেন না।