Nirbhiknewsসিইসি কে এম নূরুল হুদারাজনৈতিক দলের মধ্যে মধ্যস্থতা করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে অংশগ্রহণকালে তিনি বলেন, ‘আমাদের কারও কাছে যাওয়ার দরকার নেই। ইসি একটি স্বাধীন সত্তা। আমরা শপথ নিয়েছি, কারও চাপে নতি স্বীকার করবো না। কারও কাছে যাবো না। এটাই যথেষ্ট। তাছাড়া আমাদের এখানে আন্তর্জাতিক অনেক মিডিওকার এসেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা করাতে পারেননি। তাই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা আমরা নিতে চাই না, এটা আমাদের কাজও নয়।’

নির্বাচন কমিশন ভবনে সিইসির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এই সংলাপ। এতে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ২৬ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সংলাপের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে সিইসি বলেন, ‘এটি কমিশনের সিদ্ধান্ত। যদি পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে করি সেনাবাহিনী দরকার আছে, তাহলে থাকবে।’
বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকূল রয়েছে দাবি করে কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘বর্তমানে আমরা অনূকুল ও আস্থাশীল অবস্থানে আছি। কেউ আমাদের বিরক্ত করেননি। কমিশনে কেউ তার দাবি-দাওয়া নিয়ে আসেননি। আমরা এখনও পর্যন্ত আস্থাশীল আছি এবং থাকবো।’

নির্বাচনের সময় কী ধরনের সরকার থাকবে, সেই ব্যাপারে কমিশনের কোনও ভূমিকা নেই বলে মনে করেন সিইসি। তিনি আরও বলেছেন, ‘ইসি একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান। সরকার যে নির্বাচন পদ্ধতি ঠিক করে দেয়, সেভাবেই আমাদের ভোট কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। একসময় হ্যাঁ বা না ভোট ছিল। সেই সময়কার কমিশন সেই ভোট করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যে পদ্ধতি ছিল তারা সেটাই করেছে। আমাদের এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে আবেদনটা ছিল, সেই আবেদন সবশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কি আমরা দেখিনি? প্রধান বিচারপতি কে হবে তার হিসাব-নিকাশ করার বিষয়টিও আমরা দেখেছি। কাজেই সবকিছু নির্ভর করে সরকার কোন ধরনের পরিবেশ ঠিক করে দেয়। এখন এই সরকারের অধীনে যে অবস্থা আছে সেভাবে নির্বাচন করতে হলে আমরা সেটি করবো। আর যদি সরকার পরিবর্তন করে তাহলে সেইভাবে হবে। কাজেই নির্বাচনের সময় কোন ধরনের সরকার থাকবে সে ব্যাপারে আমাদের কোনও ভূমিকা থাকার কথা নয়। আমরা তা নির্ধারণ করতে পারিও না।’
নূরুল হুদার ভাষ্য— ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। কারও প্রতি আমাদের দুর্বলতা নেই বা কারও প্রতি কোনও শত্রুতা নেই। একইসঙ্গে কারও প্রতি কোনও আর্কষণ নেই, কারও প্রতি বিকর্ষণও নেই। আমাদের আকর্ষণ-বিকর্ষণ যাই বলেন, সেটা রয়েছে নির্বাচনি আইনের প্রতি। এজন্যই আমরা আপনাদের বিরক্ত করছি। ব্যস্ততার মধ্যেও আপনাদের আমন্ত্রণ করেছি। আমরা আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থন চাই।’

নির্বাচনের মাঠে যে অনেক সমস্যা ও জটিলতা রয়েছে তা স্বীকার করেছেন সিইসি। তিনি বলেছেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সমস্যা আমাদের আরও বেশি। কারণ গণতান্ত্রিক আয়ুষ্কাল আমাদের কম। কখনও হ্যাঁ-না ভোট, কখনও নির্বাচনি সরকারের অধীনে নির্বাচন, একব্যক্তির অধীনে নির্বাচন; এই অবস্থায় চলেছি। টানা তিনটি নির্বাচন একই নিয়মে করতে পারিনি আমরা। কাজেই সমস্যা তো আমাদের আছেই।’

এর আগে সংলাপে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ঘোর বিরোধীতা করেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের এখনও দেড় বছর বাকি। নির্বাচনে সেনাবাহিনী লাগবে নাকি আনসার বাহিনী দিয়েই হবে, তা আমরা এখনও জানি না। কিন্তু এত আগে সেনাবাহিনীর প্রসঙ্গ তুলে ধরার মধ্যে কোনও মতলবি আছে কিনা আমাদের ভাবতে হবে। এটি সেনাবাহিনীর গৌরবকে বিতর্ক করার চেষ্টা কিনা চিন্তা করতে হবে।’

কেউ রাজনৈতিক কারণে সেনা মোতায়েনের কথা বললে তা থেকে কমিশনকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন একাত্তর টিভির মোজাম্মেল বাবু। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা সহায়ক সরকারের বিরোধীতাও করেন। ভোটারদের আইডি কার্ডের নম্বর ও ভোটার নম্বর এক করার প্রস্তাব দেন এই টিভি কর্মকর্তা। এতে কার্ড নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটারদের সমস্যায় পড়তে হবে না বলে মনে করেন তিনি। প্রতিটি কেন্দ্র টেলিভিশন ক্যামেরার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে মোজাম্মেল বাবু বলেন, ‘বর্তমানে ৪০টি টেলিভিশন রয়েছে। সমন্বয় করে আমরা ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করতে চাই। এই সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে।’

একই সুরে আরটিভির সৈয়দ আশিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে টিভি ক্যামেরা বসানোর সুযোগ দেওয়া হলে কারচুপি ৯৯ শতাংশ কমে যাবে।’
সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে মত দিয়েছেন ভয়েস অব আমেরিকার আমির খসরু। তার ভাষ্য, ‘নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী ভূমিকা পালন করে সেই অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। এজন্য জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন জরুরি।’ নতুন আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কেবল আইন করলেই হবে না। সেগুলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা কমিশনের আছে কিনা তাও ভাবতে হবে। কেবল নিরপেক্ষতার কথা বললেই হবে না। ইসিকে তার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে নিরপেক্ষতার প্রমাণ আগেই দেখাতে হবে। তাদের নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান করতে হবে। বর্তমানে মাঠে যারা আছে তারা সবাই সমান সুযোগ পাচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে।’

চ্যানেল আইয়ের শাইখ সিরাজ বলেন, ‘নির্বাচনের সময় ফলাফল প্রকাশে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এজন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার ঘোষণার আগে যেন কেউ প্রকাশ না করে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য রিটার্নিং কর্মকর্তারা যেন দ্রুত ফল জানিয়ে দেন তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে যারা দায়িত্ব পালন করেন তাদের নিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
একই মন্তব্য করেছেন দীপ্ত টিভির মাহমুদুল করিম চঞ্চল। তার মতে, ‘নির্বাচনের সময় যে ৪০ হাজার প্রিজাইডিং অফিসার থাকবেন তারা নিরপেক্ষ না হলে শত চেষ্টা করলেও নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না।’

ইসিকে স্বক্ষমতা ও সাহস দেখানোর আহ্বান জানান এনটিভির খায়রুল আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন। এজন্য সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগে দায়িত্ব নেই, এমন মানসিকতা ঝেড়ে এখন থেকেই দায়িত্ব পালন করে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে কমিশনকে।’
নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক থাকলে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পড়বে না বলে মনে করেন বাংলাভিশনের মোস্তফা ফিরোজ। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের সিরিজ বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন তিনি। জাতীয় নির্বাচনে একাধিক দফায় ভোটগ্রহণ ও নোটিশ দিয়ে নিবন্ধিত দলগুলোর ধর্মীয় নাম বাদ দিতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেন এই টিভি কর্মকর্তা।
ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের খালেদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাজ লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি নয়, তাদের কাজ জনগণের আস্থা অর্জন করা। নির্বাচনের দেড় বছর আগে এসে নতুন কিছু যোগ-বিয়োগ করার কোনও দরকার নেই। এটা করতে গেলে আরও অনাস্থা তৈরি হবে।’

মাছরাঙা টেলিভিশনের রেজোয়ানুল হক রাজাও বলেছেন একই কথা। তার ভাষ্য, ‘সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ ইসির কাজ নয়। তাদের কাজ হচ্ছে যারা নির্বাচনে আসবে তাদেরকে সমান সুযোগ দেওয়া। নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের হাতে থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় না জড়িয়ে আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ এছাড়া সেনা মোতায়েনের বিরোধীতা করেছেন তিনি।

কিছু আসন পুনর্বিন্যাস ও ‘না‘ ভোট চালুর বিধান যুক্ত করার পরামর্শ দেন যমুনা টেলিভিশনের ফাহিদ আহমেদ। প্রবাসীদের ভোটার করা ও তাদের ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিতকরণ, নির্বাচনি ব্যয় বাস্তবসম্মত করা, নির্বাচনি পর্যবেক্ষক ও পোলিং এজেন্টদের অতীত ইতিহাস যাচাই করা, পরাজিত দলের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, নিবন্ধিত দলের আয়-ব্যয়ের পাশাপাশি অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিধান চালুর কথা বলেন ডিবিসির মঞ্জুরুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবারের সংলাপে অনলাইন মিডিয়ার দুজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও অংশ নেননি তারা।