Nirbhikরোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান দ্বিপক্ষীয়ভাবে করতে বাংলাদেশ চাইলেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দিচ্ছে না বলে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

সমাধানের পথে না হেঁটে মিয়ানমার উল্টো বিদ্বেষমূলক প্রচার চালাচ্ছে বলেও কূটনীতিকদের জানিয়েছেন তিনি। চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কট ও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে রোববার ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এই বৈঠকের পর মাহমুদ আলী সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেন, এই সমস্যা সমাধানে সারাবিশ্ব এখন বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসাও রাষ্ট্রদূতরা করেছেন বলে জানান তিনি। দশকের পর দশক ধরে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করে আসা বাংলাদেশে সম্প্রতি আরও তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগের রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আহ্বান জানিয়ে আসা হলেও তাতে কোনো গা করছিল না মিয়ানমার। নতুন করে রোঙিঙ্গা স্রোত আসার পর বাংলাদেশ মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ‘সেইফ জোন’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি সন্ত্রাস দমনে সীমান্তে যৌথ অভিযান চালাতেও মিয়ানমারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন,“দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের এসব প্রস্তাবে মিয়ানমার সাড়া দিচ্ছে না। “উপরন্তু তারা নানা রকম বিদ্বেষমূলক প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে,রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী বলছে, হামলাকারীদের বাঙালি সন্ত্রাসী বলছে।”

রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই নাগরিক, ইতিহাস থেকে তার পক্ষে তথ্য মেলে ধরে সাবেক কূটনীতিক মাহমুদ আলী বলেন, “সমস্যা আমরা তৈরি করিনি। মিয়ানমার সমস্যা তৈরি করেছে , মিয়ানমারকেই তা সমাধান করতে হবে।”

রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারের আচরণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ মন্তব্য করে দেশটিকে থামাতে চীন ও ভারতের দ্বারস্ত হতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাখাইন প্রদেশে যুগের পর যুগ ধরে বসবাসরত মুসলিম রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে মানতে নারাজ মিয়ানমার সরকার। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা নিপীড়নের শিকার হয়ে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এর মধ্যে গত ২৫ অগাস্ট রাখাইনে সেনা ও  পুলিশ চৌকিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর অভিযান শুরুর কথা মিয়ানমার সরকার বললেও শরণার্থীরা বলছেন, রাখাইনে নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হচ্ছে, ঘরবাড়ি লুটপাট ও জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পলায়নপর রোহিঙ্গাদের দিকে গুলিবর্ষণের পাশাপাশি এই সময়ে বাংলাদেশের আকাশসীমাও লঙ্ঘন করেছে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার। রোববারের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ডাকলেও আসিয়ান জোটভুক্ত কাউকে ডাকেননি।

আসিয়ান জোটে মিয়ানমারের সঙ্গে রয়েছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া, যারা রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মিয়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আসিয়ান জোটের রাষ্ট্রদূতদের সোমবার ডাকা হবে। রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব এখন মিয়ানমার ও দেশটির নেত্রী অং সান সু চির সমালোচনায় মুখর। সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার ফেরত নেওয়ার দাবিও তুলেছেন তুরস্কের এক মন্ত্রী।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদে লেখা এক চিঠিতে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি শামাল দেওয়া না হলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে।

এ মাসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আলোচনার প্রত্যাশাও রেখেছেন মহাসচিব গুতেরেস। রোহিঙ্গা সঙ্কটের এই সময়ে বাংলাদেশের প্রশংসায় সারা বিশ্ব এখন পঞ্চমুখ বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী।

“প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিই একবাক্যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের নেওয়া ভূমিকা সমর্থন করেছেন। এত বিরাট জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়, চিকিৎসা ও খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য নিখাদ প্রশংসা করেছে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা।”

এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ভার বহন করা দুঃসাধ্য বলে সরকারের মন্ত্রীরা বলে আসছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুকে একটি ‘জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে অভিহিত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই এখানে (বাংলাদেশ) ছিল, এরপর গত মাসের ঘটনার পর আরও তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।”

মাহমুদ আলী বলেন, “সব দেশই রোহিঙ্গা কিলিংকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে। তারা বলেছে-আমরা সবাই তোমাদের (বাংলাদেশ) সাহায্য করব।”