Untitled-1 copyশেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পাবলিক ইস্যু বিধি সংশোধনের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করে এনেছে। এ বিধি সংশোধনের চূড়ান্ত খসড়া জনমত যাচাইয়ের জন্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। এতে আইপিও প্রক্রিয়ায় শেয়ারবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনে বুক বিল্ডিং ও ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে শেয়ারদর নির্ধারণে নতুন নিয়মের প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া পর্যালোচনার পর সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) শেয়ারদর নির্ধারণে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে বলে মনে করছেন। তাদের আশঙ্কা, এ নিয়মের সুযোগ নিয়ে পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি শেয়ারদর বেশি নির্ধারণের সুবিধা নিতে পারে। তাদের মতে, বুক বিল্ডিংয়ে নিজেদের মতো করে দর নির্ধারণের সুযোগ বন্ধের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি সংশোধিত বিধিতে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রিমিয়াম চাইলে আইপিওতে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এমন নিয়মের কারণে এ পদ্ধতিতে শেয়ার বিক্রি করতে আগ্রহী কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে। এতে অনেক কোম্পানির শেয়ারদর আইপিও পর্যায়েই অতিমূল্যায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

নির্দিষ্ট মূল্য পদ্ধতিতে কোম্পানিকে অতিরিক্ত প্রিমিয়ামে আইপিও অনুমোদন দেওয়ার সমালোচনা এড়াতে এমন নিয়ম চালুর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। তবে নতুন নিয়ম কোম্পানিকে দর আরও বাড়িয়ে নিতে সুযোগ দেবে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্ট, স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে সমকালের সঙ্গে তাদের আশঙ্কার কথা জানালেও নাম প্রকাশ করতে চাননি কেউই।
এমন আশঙ্কার কারণ হিসেবে তারা অতীতে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কয়েকটি কোম্পানির দর নির্ধারণের উদাহরণ দিয়ে বলেন, শেয়ার ইস্যুকারী কোম্পানিকে সর্বোচ্চ দর পাইয়ে দিতে ইস্যু ম্যানেজার পারস্পরিক যোগসাজশে শেয়ারদর নির্ধারণ করেন। এমনকি দর নির্ধারণে ওই কোম্পানির সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানও অংশ নিয়েছে। তা ছাড়া ইস্যুকারী কোম্পানির পছন্দ অনুযায়ী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দর প্রস্তাব করতে না চাইলে তাদের দর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশ না নিতেও অনুরোধ করা হয়েছে। এমন ঘটনা আগে কয়েকবার ঘটেছে বলে তারা জানান।
এ ছাড়া প্রথম ধাপে প্রাথমিক দর নির্ধারণে (ইনডেকেটিভ প্রাইস) বেশিরভাগ কোম্পানির দর উপেক্ষা করার সুযোগ রয়েছে বিদ্যমান আইনে। এসব দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার নজির থাকার পরও তা সংশোধনের উদ্যোগ প্রস্তাবিত খসড়ায় নেওয়া হয়নি বলে তারা উল্লেখ করেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বুক বিল্ডিং নিয়ে আগের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। দেশের শেয়ারবাজার এখনও এটি গ্রহণের মতো পরিপকস্ফতা অর্জন করেনি। এ অবস্থায় এর মাত্রা বাড়ানোর চিন্তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
২০০৮ সালে চালুর পর এখন পর্যন্ত বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে দর নির্ধারণ করেছে ছয় কোম্পানি। এগুলোর বেশিরভাগের বিরুদ্ধে ইস্যু ম্যানেজারের সহায়তায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানি শেয়ারের দর বাড়িয়ে নিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছিল। এরপর ২০১১ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিও অনুমোদনও বন্ধ রাখা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারদর নির্ধারণের কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন পাওয়া একমি ল্যাবরেটরিজ ও এর ইস্যু ম্যানেজার আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ও রেজিস্টার টু দ্য ইস্যু প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধেও নিজেদের মতো করে দর বাড়ানোর একই অভিযোগ রয়েছে। এ পদ্ধতিতে ইনডেকেটিভ প্রাইস নির্ধারণে অংশ নিয়েছে আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, আইসিবি সিকিউরিটিজ ও আইসিবি। ইস্যু ম্যানেজার আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টসহ দর নির্ধারণে অংশ নেওয়া অন্য দুই প্রতিষ্ঠানও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবির সহযোগী কোম্পানি। এর আগে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসা ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশনের ক্ষেত্রেও ইস্যু ম্যানেজার লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্ট এবং রেজিস্টার টু দ্য ইস্যু আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে। এ দর নির্ধারণে ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট দরপ্রস্তাবের অনুরোধ করা হয়। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, পছন্দ অনুযায়ী দরপ্রস্তাব না করলে কোম্পানিগুলোকে দর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছিল বলে সে সময় অভিযোগ ওঠে।

একমি ল্যাবরেটরিজের ইনডেকেটিভ প্রাইস নির্ধারণ হয় ৮০ টাকা। এর আগে বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ায় ইউনাইটেড পাওয়ারের এ দর ছিল ৬০ টাকায় ও বিডিং প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত দর নির্ধারিত হয় ৭২ টাকা।
ইনডেকেটিভ প্রাইস নির্ধারণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইউনাইটেড পাওয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণে ৬২ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর থেকে দরপ্রস্তাব পেলেও কোম্পানিটি আমলে নিয়েছে মাত্র ২৮টির দর। যেসব বিনিয়োগকারীর প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয় সেগুলো ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের জন্য গড়ে ৬১ টাকা দর হাঁকা হয়েছে। বিপরীতে যাদের প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়নি, তারা গড়ে ৪১ টাকা দরপ্রস্তাব করেন। সবার প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে গড় দর হতো ৪৭ টাকা। এ পদ্ধতিতে চূড়ান্ত দর নির্ধারণে ইলেট্রনিক বিডিংয়ে শেয়ারদর নির্ধারণ হয় ৭২ টাকা।
দেখা গেছে, ইউনাইটেড পাওয়ারের ইস্যু ম্যানেজার লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্ট ইস্যু ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি আন্ডাররাইটও করছে। আবার তাদের তিন সহযোগী কোম্পানি লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, লংকাবাংলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট এবং লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ প্রত্যেকেই ৬১ থেকে ৬২ টাকা দরপ্রস্তাব করে। ইলেকট্রনিক বিডিং প্রক্রিয়ায় এরাই আবার সর্বোচ্চ ৭২ টাকা দরে শেয়ার ক্রয় করে।
শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, এখন পর্যন্ত বুক বিল্ডিং পদ্ধতির সুষ্ঠু ব্যবহার দেখা যায়নি। কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ইস্যুয়ার বা ইস্যু ম্যানেজার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দরপ্রস্তাব করছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা যেভাবে দর নির্ধারণ করছে, তাতে পেশাদার মনোভাবের পরিচয় নেই। বিদ্যমান আইনের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার পথ বন্ধ করা না হলে নতুন সংশোধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমালোচনা এড়াতে পারবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।