Norbhiknewsনির্বাচন সামনে রেখে সংসদ সদস্যদের (এমপি) সুপারিশ বাস্তবায়নের চাপে রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। গত পাঁচ মাসেই এমপিদের কাছ থেকে প্রায় দুই হাজার সেতু নির্মাণের সুপারিশ এসেছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কোনো কোনো এমপি নিজ এলাকায় একাধিক সেতু নির্মাণের সুপারিশও করেছেন।

এলজিইডি বলছে, এমপিদের সুপারিশে এর আগে নির্মিত অনেক সেতুই কাজে আসেনি। উল্টো জনদুর্ভোগ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশও। তাই এবার সুপারিশ বাস্তবায়নে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এলজিইডি। সম্ভাব্য সব ধরনের প্রভাব যাচাইয়ের পরই সুপারিশকৃত সেতুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, আশুলিয়া ইউপি অফিস-রুস্তমপুর-মিরপুর দৌউর পর্যন্ত সড়কে ৩ হাজার ৪২৫ মিটার চেইনেজে বংশী নদীর ওপর ২০০ মিটার সেতু নির্মাণের সুপারিশ করেছেন সাভারের এমপি ডা. মো. এনামুর রহমান। মানিকগঞ্জ সদরের সংসদ সদস্য জাহিদ মালেক সুপারিশ করেছেন ধলেশ্বরী নদীর ওপর ১৭৫ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের। মেঘনা নদীর ওপর ৮৫০ মিটার সেতু নির্মাণের সুপারিশ করেছেন নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য কাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলামের সুপারিশ রয়েছে তিতাস নদীর ওপর ২৩৫ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের।

জনগণের চাহিদা অনুযায়ীই সেতুটি নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে বলে দাবি করেন কাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, স্থানীয় সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শেষেই সেতু নির্মাণ করা হয়। তবে অনেক এলাকায় এর ব্যতিক্রম হয় বলে শুনেছি। মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা।
যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির একাধিক প্রকৌশলী বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অন্তত তিন বছর আগে কাজ শুরু করা উচিত। তা না করে শেষ মুহূর্তে এসে এমপিরা একের পর এক সুপারিশ করছেন। এগুলো আমলে নিয়ে সেতু নির্মাণ করলে তা কাজে আসবে না। কারণ এর আগেও এমন অনেক সেতু শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় তাড়াহুড়ো করে নির্মিত হওয়ায় এর সুফল পাচ্ছে না স্থানীয়রা।

স্থানীয় মতামত না নিয়ে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্মিত, এমন একটি সেতু সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চরনাচর ইউনিয়নের পেরুয়া-শ্যামারচর সেতু। সুরমা নদীতে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ হয় ২০১৩ সালে। নিচু করে সেতুটি নির্মাণ করায় এতে বাধা দিয়েছিল স্থানীয়রা। কিছুদিন কাজ বন্ধও ছিল। নিচু হওয়ায় মাঝারি বর্ষায়ও সেতুটির নিচ দিয়ে বড় নৌকা চলতে পারে না।

চরনাচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রতন কুমার দাশ তালুকদার বলেন, দিরাইয়ের সঙ্গে নেত্রকোনার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য পেরুয়া ও শ্যামারচর গ্রামের মধ্যখানে সেতু নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। কিন্তু সেতু নির্মাণের সময় এলাকার মানুষের সঙ্গে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। বরং সেতুর নকশায় ত্রুটির বিষয়টি উল্লেখ করে নকশা পরিবর্তনের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। আমাদের আন্দোলনের কারণে এ সেতুর কাজ কিছুদিন বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তনের আশ্বাস দেয়া হলেও তা না করেই সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে তেমন একটা সমস্যা না হলেও বর্ষায় সেতুর নিচ দিয়ে মাঝারি আকারের নৌযান চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে।
তার আগে ২০১১ সালে দিরাইয়ের সরমঙ্গল ইউনিয়নের কল্যাণী ও মাহতাবপুর গ্রামের মাঝে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬৬ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু। সর্বশেষ রাজানগর ইউনিয়নের রাজানগর ও রনারচর গ্রামের মাঝে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ৬০ মিটার দীর্ঘ আরো একটি সেতু। এ দুটি সেতুর অবস্থাও একই। অত্যধিক নিচু হওয়ায় বর্ষায় সেতুর নিচ দিয়ে বড় নৌকা চলাচল করতে পারে না।

তবে সমীক্ষা ছাড়াই শুধু সুপারিশের ভিত্তিতে সেতু নির্মাণের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে এলজিইডি। সংস্থাটির সহকারী প্রধান প্রকৌশলী মাহবুব ইমাম মোরশেদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, এমপিদের কাছ থেকে প্রতিদিনই সুপারিশ আসছে। আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ছাড়াই সেতু নির্মাণ হতো। কিন্তু এখন সে সুযোগ নেই। সমীক্ষা প্রতিবেদন ঠিকঠাক না হলে আমরা এখন আর সেতু নির্মাণ করছি না।

এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আরো যেসব এমপির কাছ থেকে সেতু নির্মাণের সুপারিশ এসেছে, তাদের মধ্যে আছেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স। পাবনা সদর উপজেলার চর শিবরামপুর সড়কে মরা পদ্মার ওপর ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের সুপারিশ পাঠিয়েছেন তিনি। রাজীবপুরে জিনজিরা নদীর ওপর ১৮০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের সুপারিশ করেছেন কুড়িগ্রামের সংসদ সদস্য রুহুল আমীন। পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম সুজন বোদা-ভাউলাগঞ্জ সড়কে করতোয়া নদীর ওপর ৪০০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের সুপারিশ করেছেন। ইসলামপুর উপজেলার বেনুয়ারচর-হরিণধরা সড়কে ১২০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের সুপারিশ রয়েছে জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খানের।

এলজিইডির পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সেতু নির্মাণের সুপারিশ আসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়েও। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের নালজোড়া এলাকায় খালের ওপর এ ধরনের একটি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করেছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেখানে উপযোগী কোনো রাস্তা নেই। সেতুর আশপাশের প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে তেমন কোনো জনবসতিও নেই। স্থানীয়রাই বলছে, সেতুটি তাদের কোনো কাজে আসবে না। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশে নির্মিত সেতুটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩১ লাখ টাকা।

কিছু অপ্রয়োজনীয় সেতু নির্মাণ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিয়াজ আহম্মদ। স্থানীয়দের কাছ থেকে সঠিক তথ্য না পাওয়ায় এমনটি হচ্ছে জানিয়ে রিয়াজ আহম্মদ বলেন, সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে আমাদের কমিটি রয়েছে, যার প্রধান স্থানীয় এমপি। ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আমরা বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় সেতুগুলো নির্মাণ করে থাকি।