chinnএশিয়ার দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে ফিলিপাইন। দুই বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছে গেছে মালয়েশিয়ার প্রবৃদ্ধি। পিছিয়ে নেই থাইল্যান্ডও। চার বছরেরও বেশি সময় পর সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে দেশটিতে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অর্থনীতির উত্থানের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে চীন। কাঠামোগতভাবে গোটা অঞ্চল দুর্বল অবস্থানে থাকলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সর্বত্র চীনা উপস্থিতি দেশগুলোর উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো উপকৃত হলেও এ অঞ্চলে চীনের আধিপত্য যেমন বিস্তৃত হচ্ছে, তেমনিভাবে চীনা নীতি অনুসরণে দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। খবর ব্যাংকক পোস্ট।

পুঁজির বহির্গমন ঠেকাতে চীনকে মূলধন নীতিমালা কঠোর করাসহ নানা সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে, যার প্রভাব অনুধাবন করছে গোটা বিশ্ব। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় ভিন্ন অবস্থান চীনের, ক্রমাগত বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলছে তারা। বিনিয়োগের সিংহভাগই গেছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেয়া ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত অবকাঠামো প্রকল্পে। তবে এখানেই শেষ নয়; গোটা অঞ্চলের সৈকত, মন্দির কিংবা শপিং মলগুলোয় চীনা পর্যটকদের আনাগোনা স্মরণ করিয়ে দেয় এ অঞ্চলে বিস্তৃত চীনা আধিপত্যের কথা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে চীনে রফতানি ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন থেকেও রফতানি বেড়েছে। চীন ধারাবাহিকভাবে এ অঞ্চলের অবকাঠামো ও সম্পত্তি খাতে তার বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর বিপরীতে এসব দেশ থেকে চাল, পাম অয়েল, রাবার ও কয়লার মতো পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে তারা। এমনকি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো থেকেও বৈদ্যুতিক পণ্য ও সরঞ্জামও কিনছে চীন।

অর্থনৈতিকভাবে গোটা অঞ্চলের সঙ্গে চীনের এ সম্পৃক্ততা সত্যিই আশাপ্রদ, তবে এর কিছু রাজনৈতিক ঝুঁকিও বিদ্যমান। বিশেষ করে যেখানে দক্ষিণ চীন সাগরের সিংহভাগের একচ্ছত্র মালিকানার দাবিদার চীনের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন। ফলে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে চীন দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এ বিষয়ে আইএইচএস মার্কিটের এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ রাজীব বিশ্বাস বলেন, চীনে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর রফতানি বাড়তে থাকায় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করায় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। চীন সরকারের অনড় অবস্থানের ছাপ পড়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন খাতে। সে সময় দেশটিতে চীনা পর্যটক কমে যায় উল্লেখযোগ্য হারে। এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনের জেরে লোটে গ্রুপ কিংবা হুন্দাইয়ের মতো দক্ষিণ কোরিয়ার যেসব কোম্পানি চীনে ব্যবসা করছিল, আর্থিক দিক দিয়ে তারাও মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজীব বিশ্বাস বলেন, দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে চীন কীভাবে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি আরো বাড়াতে পারে, দক্ষিণ কোরিয়া তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চীন সাগরের মালিকানা নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে ২০১২ সালে ফিলিপাইন থেকে ফল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চীন। পরবর্তীতে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে বেইজিংয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান নেয়ায় গত বছর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়

বৈশ্বিক ঝুঁকি নিরূপণসংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান কন্ট্রোল রিস্কের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের প্রধান ও ঊর্ধ্বতন অংশীদার ডেন কেমোরো বলেন, থাইল্যান্ডের পর্যটন, ফিলিপাইনের ফল কিংবা ইন্দোনেশিয়ার কয়লা— যেকোনো খাতের কথাই বলুন না কেন, সবগুলো খাতেই চীনের প্রভাব প্রকট।’
চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিকনির্ভরতা এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোয় ভোক্তা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত মাসে আঞ্চলিক সহযোগীদের মধ্যে পিছিয়ে থাকা ইন্দোনেশিয়া সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অন্যদিকে বাথের মান বাড়তে থাকায় কয়েক মাস ধরে চাপের মুখে আছে থাইল্যান্ডের রফতানিকারকরা। আবার পেসোর মান দুর্বল হয়ে পড়ায় চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছে ফিলিপাইন। এমতাবস্থায় চীনে কোনো কারণে সংকট সৃষ্টি হলে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো রফতানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। বিএনপি পারিবাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেন চার্লস স্যাম্বর এ বিষয়ে বলেন, চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। এমন অবস্থায় যদি চীনা অর্থনীতি শ্লথ হয়ে পড়ে, তবে তার প্রভাব হবে মারাত্মক।