http://nirbhiknews.com/wp-content/uploads/2018/05/bari-gazipur-agricultar-technology.jpgদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে। অদূরভবিষ্যতে অনেক বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে ক্রমবর্ধমান এ জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের কৃষিতে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। রয়েছে সমুদ্রের উচ্চতাবৃদ্ধির কারণে প্রচুর কৃষিজমি খোয়ানোর আশঙ্কাও। এ অবস্থায় দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবেলায় উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই এবং এ উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি।

আশার কথা হলো, ধীরগতিতে হলেও জৈব প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন জিন প্রকৌশলসহ জৈব প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ের ওপর গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষিতও করে তোলা হচ্ছে। দেশে এখন স্থানীয় পর্যায়ে এককভাবে ও যৌথ আন্তর্জাতিক প্রয়াসের ভিত্তিতে— দুভাবেই কৃষিতে জৈব প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা চলছে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে জৈব প্রযুক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছে সরকারও। জিনগতভাবে পরিবর্তিত ফসলের (জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারড বা জিই ফসল) গবেষণা ও বিপণন কার্যক্রমকে বেগবান করতে নেয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পাশাপাশি বজায় রয়েছে সরকারি নীতিসহায়তার দিকটিও। বাণিজ্যিক কৃষিতে জৈব প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটানোর বিষয়ে সরকারও বেশ আগ্রহী। উচ্চমাত্রায় ফলনশীল জিই ফসল উদ্ভাবন নিয়ে এখন প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া ও কৃষকের ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্য থেকেই বিভিন্ন সংস্থা ও ইনস্টিটিউট এখন এসব গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত ধান, আলু, বেগুন ও তুলার বিভিন্ন জিই ভ্যারাইটি উন্নয়নকে ঘিরেই এসব গবেষণা চলছে। এরই মধ্যে কৃষিতে জিই বায়োটেকনোলজির বেশকিছু সফল প্রয়োগ দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে জলবায়ু পরিবর্তন। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক (২০১৬-২০) পরিকল্পনায়ও সে কথা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ কৃষিতে অনেক বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যার অবশ্যম্ভাবী ফল হলো দারিদ্র্য ও অপুষ্টি। জলবায়ু পরিবর্তনের এ প্রভাবকে এড়ানোর নিমিত্তে নীতিনির্ধারক ও বিজ্ঞানীরা এখন বিভিন্ন ফসলের জিই জাত উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন। উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ফসলের নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং লবণাক্ততা ও খরাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের দিকে বাড়তি নজর দিচ্ছেন তারা।

দেশে এখন পর্যন্ত বারি একমাত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা কোনো জিই ফসল উদ্ভাবনের পাশাপাশি এর সফল বিপণনেও সমর্থ হয়েছে। বিটি (Bacillus thuringiensis) বেগুন নামে বিশেষ এক ধরনের বেগুন উদ্ভাবন করেছে সংস্থাটি। ২০১৩ সালে প্রথম অনুমোদন পায় বিটি বেগুন। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে বেশ সফলভাবেই এর আবাদ সম্প্রসারণ করতে পেরেছে বারি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিটি বেগুনের মোট ৯০ কেজি ৭৫০ গ্রাম বীজ উত্পাদন করে বারি। পরের অর্থবছরে বিটি বেগুনের চারটি জাতের মোট বীজ উত্পাদন হয় ৯৬৬ কেজি ৫০০ গ্রাম। কৃষক ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে বিটি বেগুনের আবাদ সম্প্রসারণ ও চাষীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিশেষ করে বন্যাদুর্গত এলাকার কৃষকদের সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে এর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বারির বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড সিড টেকনোলজি ডিভিশন মোট দেড় টন বীজ উত্পাদনের লক্ষ্য নেয়। প্রাথমিকভাবে বিটি বেগুনের চারটি জাত (উত্তরা, কাজলা, নয়নতারা, ISD006) অবমুক্ত করেছিল বারি। পরবর্তী সময়ে দোহাজারী, শিংনাথ, খটখটিয়া নামে আরো তিনটি জাত অবমুক্ত করার আবেদন জানায় সংস্থাটি। এছাড়া ইসলামপুরী ও চেগা নামে উন্নয়নকৃত স্থানীয় দুটি জাতের ওপরও এ প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে মাঠপর্যায়ে সীমিত আকারে ট্রায়াল চালানো হচ্ছে।

এছাড়া সিঙ্গেল আরবি প্রযুক্তি ব্যবহারে আলুর লেট ব্লাইট রোগ প্রতিরোধী বারি আলু-৮ উদ্ভাবন করেছে বারি। এছাড়া টমেটোর বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী জাত উন্নয়ন নিয়েও গবেষণা চালাচ্ছে সংস্থাটি।

জিন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় বারির পাশাপাশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ব্রি। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে গোল্ডেন রাইস নামে বোরো ধানের উচ্চফলনশীল ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি জাত উন্নয়ন করেছে সংস্থাটি। ব্রি উদ্ভাবিত বোরোর জনপ্রিয় একটি জাত ব্রি ধান-২৯-এর অভিজ্ঞতার আলোকেই উদ্ভাবন হয়েছে উচ্চমাত্রা বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ জিআর২-ই গোল্ডেন রাইস। এর সীমিত আকারে মাঠপর্যায়ের ট্রায়াল সফলভাবে শেষ হয় ২০১৬ সালে। জাতটি এখন অবমুক্তায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। ব্যাপক আকারে উত্পাদন শুরু হলে এ ধানের চালে রান্না হওয়া ভাত থেকে যে পরিমাণ বিটা ক্যারোটিন পাওয়া যাবে, তাতে ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি পুরোপুরি দূর হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া ব্রির বায়োটেকনোলজি ডিভিশন এখন ধানের লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনেও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে ব্রি।

মটরশুঁটির ডিএনএ হেলিকেস জিন ইনফিউশনের মাধ্যমে লবণাক্ততাসহিষ্ণু এইচওয়াইভি ধান উদ্ভাবনে ব্রির ট্রান্সজেনিক গ্রিনহাউজে সীমিত আকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে ঢাবির প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ। এছাড়া জিন ট্রান্সক্রিপশনের মাধ্যমে ধানের বাড়তি উত্পাদনশীল, প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনেও কাজ করে যাচ্ছে বিভাগটি। একই সঙ্গে ঢাবির বোটানি বিভাগ চীনাবাদাম, মটরশুঁটি ও ডালের ছত্রাক প্রতিরোধী এবং মুগ ডালের ইয়েলো মোজাইক ভাইরাস প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে।

খরা, বন্যা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু, উচ্চমাত্রায় ফলনশীল, কম জীবত্কাল ও লৌহসমৃদ্ধ জিই ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি ইনস্টিটিউট (বিনা)। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগও এখন এ ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় প্রয়াত ড. মাকসুদুল আলম ও তার সহযোগীরা পাটের জিনোম সিকোয়েন্স (জিন নকশা) আবিষ্কার করেন ২০১০ সালে। এ আবিষ্কার সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ঢাবির প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) ও বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডাটাসফটের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল গবেষণা দলটি। দেশের পাটসংশ্লিষ্টদের নতুন করে সুদিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে আবিষ্কারটি।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা এখন দেশের কৃষি খাতে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় গবেষণা কার্যক্রম চালানোর মতো পর্যাপ্ত তহবিলের বরাদ্দ নেই। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বাবদ যেসব তহবিল বা অনুদানের বরাদ্দ পাওয়া যায়, জাতীয় পর্যায়ে সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। গবেষণা কার্যক্রমে তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে কৃষিতে জৈব প্রযুক্তির ব্যবহারকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারে সরকার।

বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ও উত্পাদিত জিই পণ্য বাজারজাত, আমদানি বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়া হয় বাংলাদেশ বায়োসেফটি রুলস-২০১২ ও বায়োসেফটি গাইডলাইনস-২০০৭-এর আওতায়। এতে জৈব প্রযুক্তি খাতকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা গেলেও গোটা বিষয়টিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য তা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় বলে অভিমত খাতসংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে গবেষণা কার্যক্রমের যথোপযুক্ততা বজায় রাখার জন্যও এ আইনি কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। এছাড়া দেশের জনগণের মধ্যে জৈব প্রযুক্তি ও জিই পণ্য নিয়ে ব্যাপক ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তি রয়েছে। যথোপযুক্ত বৈজ্ঞানিক শিক্ষার মাধ্যমে এসব ভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক, আইনপ্রণেতা, ভোক্তা ও কৃষক পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যাপ্ত জ্ঞান ও ধারণা দেয়া প্রয়োজন।