Nirbhiknewsস্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বারবার প্রশ্ন করেছেন, একটি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং আক্রমণ প্র্রতিহত করার জন্য “কতটা শক্তি অর্জন যথেষ্ট?” পিয়ংইয়ং এর পরিকল্পনাকারীরা এখন হয়তো নিজেদের এ প্রশ্নই করছেন।

বুধবার উত্তর কোরিয়া তাদের নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হুয়াসং-১৫ এর পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপন করে। কয়েকজন কোন কোন বিশ্লেষকের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্কে পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।

এবছর ২০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে উত্তর কোরিয়া। এর আগে ২০০৬ সাল থেকে ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে তারা। উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তিবৃদ্ধি কি তাহলে এমন অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে তাদের শক্তিশালী পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে আমেরিকা কখনই উত্তর কোরিয়া আক্রমণে উৎসাহিত হবে না?

উত্তর কোরিয়া যদি তার দেশকে নিরাপদ মনে করে, এবং নেতারা যদি নিয়মিত দাবি করতে পারেন যে তাদের পারমাণবিক এবং ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র শুধুই নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার খাতিরে, তাহলে সেক্ষেত্রে কিম জং আন হয়ত একটা শক্ত অবস্থানে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।
এমন আলোচনার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার নেতা মি: কিম তার দুটি কৌশলগত লক্ষ্য একসাথে পূরণ করতে পারবেন। এক- জনগণের কাছে নিজের নেতৃত্বকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলা; পাশাপাশি সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।

সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সঙ্গে দেওয়া উত্তর কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থার বিবৃতি অনুযায়ী, সর্বশেষ পরীক্ষাটি ছিল দীর্ঘ মেয়াদী প্রযুক্তিগত পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল। কিম জং আনের ভাষ্যমতে “পারমাণবিক শক্তি অর্জনে রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন – যেদিন দেশটির পরমাণু শক্তি অর্জনের লক্ষ্য পূর্ণ হল।”
তবে এই পরীক্ষা প্রযুক্তিগত দিক থেকে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা উত্তর কোরিয়ার এমন আরও পরীক্ষা চালানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে ।
যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের আশঙ্কা, আন্ত: মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পারমাণবিক বোমা তৈরির এবং আমেরিকার কোন শহরকে লক্ষ্য করে নির্ভুলভাবে তা উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জনের খুব কাছাকাছি উত্তর কোরিয়া পৌঁছে গেছে। তথ্যপ্রমাণ যা পাওয়া গেছে তাতে মনে হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার এই লক্ষ্য অর্জন করতে অন্তত আরও কয়েকমাস বা সম্ভবত আর এক থেকে দুই বছর সময় লাগবে।

কাজেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিখুঁতভাবে আঘাত করার জন্য আরো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করতে হবে উত্তর কোরিয়াকে। সমরাস্ত্র পরীক্ষার অন্যতম একটা প্রধান উদ্দেশ্য থাকে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বাইরেও নিজের শক্তি প্রদর্শন এবং শত্রুর দিক থেকে চাপ প্রতিহত করা।
উত্তর কোরিয় কর্মকর্তারা বাইরের উস্কানির মুখে নিজেদের দুর্বল না দেখানোর ব্যাপারে প্রায়ই সচেষ্ট থেকেছেন বিশেষ করে পিয়ংইয়ংয়ের ঐতিহাসিকভাবে বৈরি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামনে।

উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণ পিয়ংইয়ং-এর যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বড় কারণ। মি: ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন, কিম জং আনকে “রকেট ম্যান” বলে তাচ্ছিল্য করা, আন্তর্জাতিকভাবে উত্তর কোরিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ আর উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক বলে দেশটিকে তালিকভূক্ত করায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার বৈরি সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজের কঠিন অবস্থানকে হয়ত কূটনৈতিক বিচক্ষণতা মনে করছেন। যার মাধ্যমে তিনি মনে করছেন উত্তর কোরিয়া আর চীনের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন তিনি। তবে তার এই অদূরদর্শী কৌশলকে উত্তর কোরিয়ার কোন্ চোখে দেখবে সেটা তিনি বিবেচনায় নিচ্ছেন না।

এখন পর্যন্ত আমেরিকার সাথে উত্তর কোরিয়ার কোনোরকম আলোচনার লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। চীন ও রাশিয়ার প্রস্তাবিত “ফ্রিজ ফর ফ্রিজ” উদ্যোগেও কোনো সাড়া দেয়নি তারা।
“ফ্রিজ ফর ফ্রিজ” উদ্যোগে প্রস্তাব ছিল উত্তর কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষা বন্ধ করলে তার বদলে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা তাদের যৌথ সেনা মহড়া বন্ধ করবে।
তবে মি: কিম তার আগ্রাসনে অন্তত কিছুটা সংযম দেখিয়েছেন। ১৫ই সেপ্টেম্বরের পর তিনি সর্বসাম্প্রতিক পরীক্ষাটি চালিয়েছেন প্রায় আড়াই মাস পরে।
কিন্তু উত্তর কোরিয়া কতদিন চুপ করে থাকবে?

উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে বায়ুমণ্ডলীয় পারমাণবিক পরীক্ষার সম্ভাবনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীতে সাইবার আক্রমণ, অথবা পশ্চিম উপদ্বীপ দিয়ে নৌ ঘাঁটিতে আক্রমণের মত সম্ভাবনাও রয়েছে। তা ঘটলে প্রত্যুত্তরে সীমিত আকারে হলেও কঠিন পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া।
আর সেই পদক্ষেপকে যদি ভুল বোঝে উত্তর কোরিয়া, তাহলে তারা আরও বড়ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। সেক্ষেত্রে দ্রুত অবস্থার অবনতি হতে পারে এবং পারস্পরিক বিধ্বংসী অবস্থা তৈরি হতে পারে।

এক্ষেত্রে, একপক্ষ যে কৌশলকে নিজের স্বার্থরক্ষা ও প্রতিপক্ষের প্রতি হুঁশিয়ারি হিসেবে বিচার করছে, প্রতিপক্ষ সহজেই সেটিকে মাত্রা অতিক্রম করা ও ইচ্ছাকৃত প্ররোচনা বলে মনে করতে পারে। আর সেটাই সহজে পরিস্থিতির ভারসাম্য নষ্ট করে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সূত্র: বিবিসি