bishawjitপুরান ঢাকায় দরজি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আট আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন এবং অপর দুজনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ১৩ আসামির মধ্যে যে দুজন আপিল করেছিলেন, তাঁরা খালাস পেয়েছেন।

বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আসামিদের আপিলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল রোববার বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া খালাসপ্রাপ্ত দুজন হলেন সাইফুল ইসলাম ও কাইয়ুম মিয়া। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আট আসামির মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলেন মাহফুজুর রহমান ওরফে নাহিদ, রাশেদুজ্জামান ওরফে শাওন, ইমদাদুল হক ও নূরে আলম (পলাতক) ওরফে লিমন। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন রফিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল ও রাজন তালুকদার (পলাতক)।

নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন দণ্ডিত ১৩ আসামির মধ্যে দুজন খালাস পেয়েছেন। তাঁরা হলেন এইচ এম কিবরিয়া ও গোলাম মোস্তফা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া অপর ১১ আসামির সবাই পলাতক। তাঁদের ব্যাপারে আদালত কোনো মন্তব্য করেননি।

আসামিদের সবাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন।

ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন অসামঞ্জস্যপূর্ণ:

রায়ে আদালত বিশ্বজিতের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল হকের দায়িত্বে অবহেলা ও পেশাগত অসদাচরণ হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজিতের লাশের ময়নাতদন্তকারী সলিমউল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের তখনকার সহকারী অধ্যাপক মো. মাকসুদের পেশাগত অসদাচরণ হয়েছে কি না,তা-ও তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনার বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও সময়ে সময়ে আদালতকে জানাতে আইনজীবী মনজিল মোরসেদকে বলা হয়েছে।

রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বজিতের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যে একটি গুরুতর আঘাতের কথা উল্লেখ আছে, এর সঙ্গে সাক্ষ্য, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ভিডিও ফুটেজ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আদালতের কাছে ওই প্রতিবেদন দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণমনে হয়েছে। এ ছাড়া সাজা পাওয়া আসামিদের অংশগ্রহণে বিশ্বজিৎকে একাধিক আঘাত করা হয়েছে বলে সাক্ষ্যদৃষ্টে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

ছাত্ররাজনীতি দূষিত:

রায়ে বলা হয়, ইদানীং ছাত্ররাজনীতি তার জৌলুস হারিয়ে দূষিত হয়ে পড়েছে কিছু বিপথগামী তরুণের কারণে, যারা চাঁদাবাজি, অস্ত্র-মাদক ব্যবসা, খুন, রক্তারক্তিতে জড়িয়ে পড়েছে। ওপরের সারির কিছু নেতা তাদের আশ্রয়-প্রশয় দিয়ে থাকেন।

রায়ে বলা হয়, এমনও দেখা যায়, পরীক্ষায় নকল করতে না দেওয়ায় শিক্ষককে মারধর করা হয়েছে। এটি ছাত্ররাজনীতির জন্য উদ্বেগজনক। কারণ, তারাই ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেবে।

আদালত বলেছেন, ক্ষমতায় বা বিরোধী দলে যেখানেই থাকুন, জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের দায়িত্ব ছিল এই সমস্যার দিকে নজর দিয়ে তা সমাধান করা। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের দায়িত্ব এসব বন্ধে অবস্থান নেওয়া।

চারজনের অপরাধ প্রমাণ হয়নি:

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর সকালে পথচারী বিশ্বজিৎ দাসকে বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। দেশব্যাপী আলোড়ন তোলা ওই হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ রায় দেন। বিচারিক আদালতের রায়ে ২১ আসামির মধ্যে ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গতকালের রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুজ্জামান বলেন, ভিডিও ফুটেজ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। অপর চারজনের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের খালাস দেওয়া হয়েছে।