অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো খুব ভালো সংকেত দিচ্ছে না। রপ্তানি এক মাসে বাড়ছে তো, পরের মাসেই কমে যাচ্ছে। আমদানিতে এখন ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। প্রবাসী-আয় বা রেমিট্যান্সেও তাই। কমেছে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও ঋণপত্র বা এলসি খোলার পরিমাণ। শিল্প উৎপাদন সূচকেও দেখা দিয়েছে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, অর্থনীতির গতি খানিকটা মন্থর হয়ে গেছে। কমেছে উত্তাপ। অর্থনীতিতে একধরনের স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। সূচকগুলো নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে। দেশে অনেক দিন ধরেই সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল। বাজেট ঘাটতিও নিয়ন্ত্রণে। তবে এখন উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সূচক খারাপ সংকেত দিচ্ছে বলেই তাঁরা মনে করছেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতিতে বিনিয়োগের চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে না। ব্যক্তি খাতের অনিশ্চয়তাও কাটছে না। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে একধরনের দুশ্চিন্তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেটাকে কাটিয়ে উঠতে হলে বিনিয়োগের যত ধরনের অনিশ্চয়তা আছে, তা দূর করতে হবে।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের মধ্যে সবচেয়ে দেরিতে পাওয়া যায় শিল্প উৎপাদন সূচকের তথ্য। মাত্রই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জুলাই মাসের সূচক প্রকাশ করেছে। ওই মাসে শিল্প উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। উৎপাদন কমেছে মূলত প্রধান প্রধান পণ্যেই। যেমন, পোশাক উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি কমেছে ১২ শতাংশ, চামড়া পণ্যে ৭ শতাংশ, ওষুধে ৬ শতাংশ এবং সুতা ও বস্ত্র উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪ শতাংশ। এমনকি তামাকজাত পণ্যেও প্রবৃদ্ধি এখন ঋণাত্মক ২৫ শতাংশ।
আমদানি ব্যয়ের পরিসংখ্যানেও একই প্রবণতা। সেখানেও শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমদানির প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক, ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। যদিও আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৩২ শতাংশ। পুঁজি পণ্যের আমদানিও কমে গেছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক, ২০ শতাংশ। পুঁজি যন্ত্রপাতির আমদানির প্রবৃদ্ধিও ঋণাত্মক, ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সূচকগুলো স্থবির বিনিয়োগেরই সংকেত দিচ্ছে।
বিশ্ববাজারে এখন জ্বালানি তেলসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম গড়ে প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এরও একটি প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যয়ে। তবে দেশের মোট আমদানির সবচেয়ে বড় অংশই হচ্ছে শিল্পের কাঁচামাল। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যত টাকার ঋণপত্র খোলা হয়েছে, তার ৪০ শতাংশই শিল্পের কাঁচামাল। আর আগের বছরের তুলনায় অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ঋণ খোলার প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক, ৫৭ শতাংশ।
প্রবাসী-আয়ের চিত্রটিও খুব বেশি ভালো না। গত অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে প্রবাসী-আয়েও প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে প্রবাসী-আয় কমেছে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি আছে ৫ শতাংশ। যদিও অর্থবছরটি শুরু হয়েছিল ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি নিয়ে। এ ছাড়া বিনিময় হারও অনেক দিন ধরেই স্থিতিশীল। মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে। ফলে এই দুই দিক থেকে অন্তত অর্থনীতি এখনো স্বস্তিতেই আছে।
অর্থনীতির জন্য আরেকটি দুশ্চিন্তার জায়গা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। সরকার এবার রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের লক্ষ্য ঠিক করে রেখেছে। সরকারের আশা এবার রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি হবে ২৯ শতাংশ। অথচ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ৭ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে, অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
এনবিআর সূত্রগুলো বলছে, দেশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কম থাকলে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে থাকলেও রাজস্ব কর্মকর্তারা খুব একটা স্বস্তিতে থাকেন না। কারণ তাতে রাজস্ব আদায় কম হয়। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আমদানি শুল্ক আদায় হয় পণ্যের দামের ভিত্তিতে, পরিমাণ নয়। এখন বিশ্ববাজারেও সব ধরনের পণ্যের দাম কমেছে। এতে রাজস্ব আদায়ও কম হচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থনীতিতে এত দিন আলোচনা ছিল সামষ্টিক অর্থনীতির যে স্থিতিশীলতা, তাকে বিনিয়োগ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি। এটাই ছিল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সাম্প্রতিক বেশ কিছু সূচকে সেই জায়গাগুলোতে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। এগুলোকে এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।’